মোঃ তাজিদুল ইসলাম:
স্বপনের দেশ গ্রীসে কাজে থাকা সহকর্মীদের গণপিটুনিতে সুনামগঞ্জ শান্তিগঞ্জের রাজা মিয়া খুন হয়েছে।
রাজা হোসেনের আত্মীয় ও গ্রামের শালিস ব্যক্তিত্ব লুৎফুর রহমান বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের সলফ গ্রামের বাসিন্দা সেবুল মিয়ার অধীনে গ্রিসে কাজ করতো রাজা। সেবুল মিয়া ছুটিতে দেশে আসার সময় রাজা হোসেনকে ফোরম্যানের দায়িত্ব দিয়ে আসেন। এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এক সাথে থাকা গ্রিসে কর্মরত সলফ গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম আলী ওরফে ইব্রাই’র ছেলে রফিক আহমেদ, একই গ্রামের মৃত মনাফের ছেলে সেজুল হোসেন, হবিগঞ্জের রেজাউল করিম, জামাল হোসেন ও রাহুল। ২৫ জুলাই মোটরসাইকেল যোগে কাজে যাওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলের উপরে বসে দেশে থাকা একজন মহিলা আত্মীয়ের সাথে ভিডিও কলে কথা বলছিলেন রাজা। তখন তার সামনে রফিকও ছিলো। ঠিক তখন পেছন থেকে তাকে আঘাত করে গ্রিসে কর্মরত সলফ গ্রামের বাসিন্দা, মৃত মনাফের ছেলে সেজুল হোসেন, হবিগঞ্জের রেজাউল করিম, জামাল হোসেন ও রাহুল। পুরো ঘটনাটি ভিডিও কলে থাকা মহিলা দেখেছেন। ঘটনার ৩ দিন পর পরিত্যাক্ত স্থানে একটি টিন দ্বারা ঢাকা অবস্থায় রাজা হোসেনের লাশ পাওয়া যায়।
আট ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয় রাজা হোসেন। চার ভাইদের মধ্যে প্রথম তিনি। বাবা আবদুল জলিল ছিলেন ওমান প্রবাসী। ছেলেকে ওমানে রেখে ২০১৯ সালে বাড়ি ফিরে পরের জমি বর্গাচাষ করে কোনো রকমে বড় সংসারের ঘানি টানছেন তিনি।
২৫ জুলাই শুক্রবার বাংলাদেশি সহকর্মীদের দ্বারা খুন হওয়ার এমন অভিযোগ করেছেন রাজা হোসেনের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন।
নিহত রাজা হোসেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের পূর্বপাড়ার বাড়ির বাসিন্দা। শুক্রবার বিকালে রনসী গ্রামে সাংবাদিকদের কাছে ছেলে হত্যার এমন অভিযোগ করেন মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজন। সেই সাথে হত্যাকা-ের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ও চান তারা। দাবি জানান, লাশটি যেনো দ্রত বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। রাজা হোসেন হত্যার ঘটনায় শুধু তার পরিবারে নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে সমস্ত রনসী গ্রামে।
শুক্রবার বিকালে নিহত রাজা হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিন শেডের অর্ধভাঙা ঘরে থাকেন তার পরিবার। পরিবারে শোকের আবহ। সাংবাদিক যাওয়ার খবরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন রাজার মা নিবারুন নেছা।
জীবনের সকল সহায় সম্পত্তি হারিয়ে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা ধারদেনা করে দেড় বছর আগে রাজা হোসেনকে ইউরোপের দেশ গ্রিসে পাঠিয়েছিলেন আবদুল জলিল। ওমান থেকে ইরান ও তুর্কি পাড়ি দিয়ে রাজা হোসেন স্থান করে নিয়েছিলেন গ্রিসে। এর মধ্যে একবার বন্দি ছিলেন মাফিয়াদের হাতে। তবুও স্বপ্ন ছিলো বাবাকে ঋণমুক্ত করে একটি দালান ঘর তৈরি করে দেবেন রাজা। ভাই-বোনদের লেখাপড়া করাবেন নিজ খরচে। চার বোনকে বিয়ে দেওয়া ও বাকী ভাইদের প্রবাসে পাঠানোর মতো বড় স্বপ্ন ছিলো তার। কিছুই হলো না। বাবাকেও ঋণ মুক্ত করতে পারলেন না রাজা। এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই গ্রিসে সহকর্মীদের হাতে নিহত হতে হয়েছে তাকে।
সবাই আসে আমার রাজা আসে না কেনো? সবার সামনে এমন নিরুত্তোর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ছেলে হারা মা। তাঁর কান্নায় ভারী হয় পুরো পরিবেশ। উপস্থিত সকলের চোখ ভিজে উঠে। ছেলে হত্যার বিচার চান তিনি। তিনি বলেন, প্রতিদিন আমার ছেলে খোঁজ নিতো। আমার ছেলে আজ ৭দিন থেকে খোঁজ নেয় না।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন বাবা আবদুল জলিলও। এত দিনের কান্নায় হয়তো চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে তাঁর। তিনি জানান, উভয় সংকটের কথা। সংসারে এখন তিনি এতোটা অর্থনৈতিক সাপোর্ট করতে পারেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলো রাজা। ২১ লক্ষ টাকার মতো ঋণে আছেন তিনি। মাফিয়াদের হাতে বন্দি থাকাকালীন সাড়ে ১২ লক্ষ টাকা দিয়ে ছাড়িয়েছিলেন তাকে। ধাপে ধাপে আরো ৮ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। মাত্র ২ লক্ষ টাকা পরিরোধ হয়েছিলো। এখনো প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা ঋণে রয়েছেন তিনি। পরিবারের সকল স্বপ্নই তাকে ঘিরে করে গড়ে উঠছিলো। আরেক ভাইকে বিদেশে পাঠানোরও পরিকল্পনা করছিলো রাজা। ছেলে হত্যার বিচারের দাবি করেন তিনি।
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি চাই। আর যত দ্রুত সম্ভব তার লাশটি যেনো আমাদের কাছে পাঠানো যায় সেই ব্যবস্থা করুক। অন্তত ছেলেটিকে দেখলে মনটা তুষ্ট হবে।
কলেজ পড়ুয়া বোন রুবেনা বেগমও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমাদের লেখাপড়া নিয়ে তিনি খুবই সচেতন ছিলেন। সব সময় বলতেন, যতটুকু পড়তে পারো পড়ো। আমি তোমাদের পড়াশোনার খরচ দেবো। এখন আমাদের কী হবে?
এলাকাবাসীও রাজা হোসেন হত্যার বিচার দাবি করেছেন। ইউপি সদস্য রুপন মিয়া ও সমাজকর্মী তুরণ খান বলেন, রাজা হোসেন একজন ভালো ছেলে ছিলো। পরিবারের প্রতি ভালো টান ছিলো। তার বাবা ধারদেনা করে বিশ বাইশ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে পাঠিয়ে ছিলেন। এখন এরা নিঃস্ব হয়ে গেলো। আমরা দ্রুত এই হত্যাকা-ের বিচার চাই। সেই সাথে লাশটি যেনো দ্রুত দেশে ফিরে আসে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
অভিযুক্ত রফিক আহমদের চাচা কাজি আইয়ুব আলী বলেন, আমার ভাতিজা এই হত্যাকা-ের সাথে জড়িত কি না তা আমরা নিশ্চিত নই। এই ঘটনা ঘটার পর থেকে তার সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা প্রথম খবর পেয়েছি নিহত রাজার পরিবার থেকে। এর আগে আমরা বিষয়টি জানতামই না।
তিনি আরও বলেন, আমার ভাতিজা এমন ছেলে নয়, সে একটু ভীতু। হত্যাকা-ের খবর পেয়ে ভয়ে হয়তো কোথাও সরে গিয়েছে। এমন ঘটনা সে ঘটাতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস হয় না।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি আকরাম আলী বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। ঘটনাটি যেহেতু ঘটেছে গ্রিসে সেহেতু সেখানেই মামলা হবে। আমার এখানে মামলা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে, নিহতের পরিবার আমার কাছে যতটুকু আইনি সহযোগিতা চাইবেন আমরা তাদেরকে সেই সহযোগিতা করবো।






