ছাতক(সুনামগঞ্জ)প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাবার সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের খাদ্য বিতরণে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের মাঝে দুধ কলা ডিম সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কোন কোন বিদ্যালয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই সপ্তাহে দুধ দেওয়া হলেও অনেক বিদ্যালয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র একদিন।
জানা যায়, উপজেলার ১৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৩২ হাজার ৯২২ জন শিক্ষার্থীর জন্য গেল ৪ এপ্রিল থেকে ১০ শতাংশ অনুপস্থিত ধরে ৯০ শতাংশ খাদ্য সরবরাহ শুরু করে ‘হাসান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের সরবরাহকৃত পাউরুটি, ডিম ও মৌসুমি ফলের মধ্যে নানা অনিয়ম ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী, সাপ্তাহিক খাদ্য তালিকায় রয়েছে রোববার পাউরুটি (১২০ গ্রাম), সোমবার পাউরুটি ও ২০০ গ্রাম তরল দুধ, মঙ্গলবার ৭৫ গ্রাম ফোর্টিফায়েড বিস্কুট ও মৌসুমি ফল এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার পাউরুটি ও সিদ্ধ ডিম (১২০ গ্রাম)। তবে বাস্তবে এ তালিকায় গরমিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতি সোমবার দুধ সরবরাহের কথা থাকলেও গত দুই সপ্তাহে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মাত্র একদিন দুধ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে মঙ্গলবার মৌসুমি ফল দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনিয়মিতভাবে বিতরণ করা হয়েছে। এসব দুধ সরবরাহ করছে ব্র্যাক।
শিক্ষকদের অভিযোগ, শুরু থেকেই খাদ্যের মান ও পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শক্ত ও মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটি পাওয়া যায়। প্রতি বিদ্যালয়ে ৪-৫টি করে নষ্ট ডিম এবং সময়মতো খাদ্য সরবরাহ না করার ঘটনা ঘটছে। এমনকি ডিম সিদ্ধ করে দেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাঁচা ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে দাবি করা হয়েছে, ডিম সিদ্ধ করার জন্য প্রতি ডিমে বিদ্যালয়কে অতিরিক্ত ১ টাকা ৫০ পয়সা করে দেওয়া হয়। বাস্তবে কাগজে-কলমে হিসাব দেখিয়ে বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারের অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, ৪ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দুধ কলা দেওয়া হয়েছে ১দিক করে এসব বিল উত্তোলন করা হলে মাত্র ১২ দিনেই সরকারের ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ হবে। সপ্তাহে একদিন দুধ সরবরাহ না করলে প্রায় ৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে ফল ও দুধ ছাড়া শুধু বিস্কিট সরবরাহকারী প্রতিষ্টান একটি বিল উত্তোলন করেছে বলে জানা গেছ।
উত্তর খুরমা ইউনিয়নের মহনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিখিল রায় জানিয়েছেন অন্যান্য পণ্য দেওয়া হলেও ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত তার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দুধ কলা দেওয়া হয়নি।
একদিন দুধ কলা পেয়েছেন জানিয়ে চাইরচিরা রণমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলি দাশ জানান, পাউরুটির মান ভালো নয়, একদিন মেয়াদোত্তীর্ণ পাউরুটিও দেওয়া হয়েছে।
কাশিপুর চিকনাকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল মালিক জানিয়েছেন গেল ১১ এপ্রিল তার বিদ্যালয়ে তিন দিনের দুধ দেওয়া হয়েছে। তবে পুর্বেরগুলা পাননি। আর ৭ এপ্রিল কলা দেওয়া হয়েছে।
চারিগ্রাম চরদুর্লভ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাতেমা বেগম বলেন ৮ এপ্রিল দুধ দেওয়া হয়েছে, এর আগে দেওয়া হয়নি। পাউরুটিগুলো শক্ত।
দোলারবাজার ইউনিয়নের ১০০ নং কুর্শি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কবির আহমদ গেল ২৯ মার্চ একদিন দুধ সরবরাহ করলে তিনি ৬ এপ্রিল তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করেছেন। ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একদিন তাদের বিদ্যালয়ে দুধ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কুর্শি পূর্বপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছফেরা বেগম ও দক্ষিন কুর্শি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শফিকুর রহমান। তাদের বিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত মাত্র একদিন করে কলাও সরবরাহ করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
খারাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খালেদা বেগম জানান, ১৯৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৬৮ জন খাবার পাচ্ছে। দুধ ও কলা একদিন করে দেওয়া হয়েছে। মাঝেমধ্যে কম দেওয়া হয়, অভিযোগ করলে পরদিন সমন্বয় করা হয়।
গাগলাজুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুবকর বলেন, ৯ এপ্রিল একদিন দুধ পেয়েছি, এর আগে পাইনি। কলাও একদিনই দেওয়া হয়েছে।
চরচৌলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল হাই জানান, সরবরাহ দিয়ে চলে যায়। কিন্তু বন্টনের সময় প্রায়ই ৪-৫টি নষ্ট ডিম পাওয়া যায়। আমাদের স্কুলে ৮ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে একদিন করে দুধ ও কলা পেয়েছি।
উত্তর খুরমা ইউনিয়নের গদারমহল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কবির আহমদ জানান, ১৬ এপ্রিল তিনি প্রাথমিক বৃত্তি পরিক্ষার ডিউটিতে থাকাবস্থায় শুনেছেন ওইদিন তার বিদ্যালয়ে এই প্রথম দুধ সরবরাহ করেছে।
এদিকে, ৫ ও ১২ এপ্রিল সোমবার দুধ সরবরাহের কথা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মাত্র একদিন দুধ দেওয়া হয়েছে। কোন কোন বিদ্যালয়ে দুধ ও ফল একেবারেই দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে হাসান এন্টার প্রাইজের ছাতকে সুপারভাইজার রফিকুল তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দুধ বিস্কিট আমরা দিচ্ছিনা, আমরা দিচ্ছি কলা, পাউরুটি ও ডিম। প্রথম দিকে কিছু ভূলক্রুটি হলেও পরবর্তীতে সমাধান করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পর স্কুল শিক্ষকরা ২/৩দিন পর বিতরণ করেন। এছাড়া প্রতিটি ডিম সিদ্ধের জন্য দেড় টাকা করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হলেও তারা অনেকেই শিক্ষার্থীদের কাঁচা ডিম বিতরণ করছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান আহমদ বলেন, সরকারের ২২ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পটি কেন্দ্র থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া এখানে সরবরাহে প্রথম অবস্থায় কিছুটা ভূলক্রুটি হলেও বর্তমানে সরবরাহে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে শুধু বিস্কিটের এক মাসের একটি বিলে তিনি ছাড়পত্র দিয়েছেন। রুটিন অনুযায়ী যেসব খাদ্যপণ্য দেওয়া হয়নি তা স্কুলগুলো থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী বিলের সুপারিশ করা হবে।






