ছাতকে খাদ্যগুদামের ধান ক্রয় করে অর্ধকোটি টাকা কামিয়েছেন নারী কর্মকর্তা।

ছাতক(সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 
সুনামগঞ্জের ছাতকে সরকারী খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের নামে চলছে অনিয়ম-দূর্নীতি ও ঘুস বাণিজ্যের মহোৎসব। সরকারী নিয়ম নীতির তুয়াক্কা না করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় অংকের ঘুস ক্যালেঙ্কারির মাধ্যমে ধান ক্রয় করার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, খোদ খাদ্যগুদাম এর কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও বিভিন্ন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে যৌথভাবে ধান ক্রয় করে গুদামে বিক্রি করছেন। ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা আর লাভবান হচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ী ও খাদ্যগুদাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারিরা।
ছাতক খাদ্যগুদাম সূত্রে জানা যায়, গেল ২৪ মে থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এখানে ধান সংগ্রহ শুরু হয়। লক্ষমাত্রা ধরা হয় ৯৪৫ মেট্রিকটন। ৩১ আগষ্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের কথা রয়েছে। কিন্তু গেল ১৮জুন পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।
জানা গেছে, এবছর স্থানীয় বাজারে প্রতি মন (বড়) ধানের মুল্য ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা। কৃষকদের উৎসাহীত করতে ভর্তূকির মাধ্যমে সরকারী মুল্য ধরা হয়েছে ১৪৪০ টাকা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকেই স্থানীয় বাজার থেকে বড় ধান সংগ্রহ ও কৃষক ভাড়ার মাধ্যমে অনিয়ম-দূর্নীতি করে যাচ্ছেন। সুযোগটি হাত ছাড়া না করে গুদাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বিশ্বস্থ লোক দিয়ে বিভিন্ন মিল থেকে সরকারী বস্তায় ধান বস্তাজাত করে গাড়ি যোগে সরাসরি গুদামে বিক্রি করছেন। ২০২০-২১-২২ সালের বস্তা আগে থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে দিয়ে দেয় গুদাম কর্মকর্তারা। এসব বস্তা বাহিরে আটক হলে বলা হয় পুরনো বস্তা ক্রয় করে আনা হয়েছে। অতচ গুদাম ভর্তি রয়েছে পুরনো বস্তায় সংরক্ষিত ধান। এছাড়া বিভিন্ন অযুহাতে ব্যবসায়ীরা প্রতিটন ধান ৪ হাজার টাকা হারে ঘুষ দিতে হচ্ছে খাদ্যগুদাম এর কর্মকর্তাকে। অন্যান্য বছর লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হলেও এ বছর পকেট ভারি করার জন্য লটারি হয়নি। বিভিন্ন কৃষকদের সাথে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেলেও তারা নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। তবে বিভিন্ন কৌশলে মোবাইল ফোনে ও গোপন ক্যামেরায় ধারনকৃত অডিও- ভিডিওতে উঠে এসেছে অনিয়ম-দূর্নীতির একাধিক তথ্য। যা সংরক্ষিত আছে এই প্রতিবেদকের কাছে। কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের কথা থাকলেও অধিকাংশ ধান ক্রয় করা হচ্ছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও মিল ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। কৃষক ভাড়া করে আর ঘুষের বিনিময়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ধান।
কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী এ বছর প্রায় ৩০০ টন ধান গুদামে বিক্রি করেছেন আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী ও আওয়ামীলীগ নেতা। পিএস ইয়াকুব, গুদাম কর্মচারি আবুল কাশেম ও লেভার সর্দার আবদুল করিমের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ধান বিক্রি করেছেন খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা নিজেই। তিনি উপজেলার সাদারাই গ্রামের ছুরুক মিয়া ও আলমপুর (ভাওয়াল) গ্রামের আবু তাহেরসহ বিশ্বস্থ লোক দিয়ে এসব ধান ক্রয় করে তার গুদামে নিজেই বিক্রি করে আসছেন। ধান বিক্রি করেছেন বিএনপি নেতা ব্যবসায়ী সমছুদ্দিন, চেচানের ব্যবসায়ী আনোয়ার, জাউয়ার মিল ব্যবসায়ী ও আওয়ামীলীগ নেতা পিলিপ বাবু, বুড়াইরগাঁও এর আনোয়ারা অটো রাইছ মিল এর জনৈক ব্যবসায়ী সহ আরও একাধিক ব্যবসায়ীরা। চাউল ক্রয়েও রয়েছে তাদের সিন্ডিকেট।
তারা জেলার ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিন্ম মানের ধান ক্রয় করে খাদ্যগুদামে ঘুষের বিনিময়ে বিক্রি করে আসছেন। আর ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে সহজ স্মরল মনোনীত কৃষক ভাড়ায় এনে খাদ্যগুদামের স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ধান বিক্রির টাকা উত্তোলন করছেন। এসব দেখার যেন কেউ নেই। এ থেকে শুধু খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রায় অর্থ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অসাধু ব্যবসায়ীরা তো আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ!
কৃষি বাতায়ন তথ্য মতে এ উপজেলায় ৮ হাজার ২৫জন কৃষক রয়েছেন। কিন্তু গুদামের তথ্য অনুযায়ী মাত্র ৭৪ জন কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে কৃষি অফিস থেকে। তাও ৬৪ জনের তালিকায় কৃষি কর্মকর্তার সিল সাক্ষর নেই। সময়ের অভা তা নিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন গুদাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। প্রকৃত পক্ষে হাতেগুনা কয়েকজন কৃষক ঘুস দিয়ে ধান বিক্রি করলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা কৃষক ভাড়ায় এনে গুদাম কর্তৃপক্ষকে ঘুস দিয়ে তাদের নাম ব্যবহার করে ধান গুদামজাত করছেন। ছাতক সোনালী ব্যাংকের গত দুই মাসের সিসি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেও কৃষকদের সাথে নিয়ে ব্যবসায়ীরা টাকা তুলার দৃশ্য প্রমানিত হবে। এতে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারি মিলেমিশে একাকার।
অভিযোগ উঠেছে, তদারকি না থাকায় খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার নিজস্ব লোক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের পর গুদামে বিক্রি করে ঘুসের রাম-রাজত্র কায়েম করছেন। ক্যালকোলেটর হিসেব বলছে, ইতিমধ্যে সংগ্রহকৃত ৭০০ মেট্টিকটন ধানে ৪ হাজার করে ঘুষ নিলে তাদের বাণিজ্য হয়েছে ২৮ লাখ টাকা। আর লক্ষমাত্রা অনুযায়ী ৯৪৫ মেট্টিকটন সংগ্রহের পর শুধু ঘুস বাণিজ্য দাড়াবে ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। নিজস্ব লোক দিয়ে ধান ক্রয় করে গুদামজাত করলে প্রতি মন ধানে লাভ আসছে ৩০০ টাকা৷ এতেও কয়েক লক্ষ টাকা বাণিজ্য করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। সব মিলিয়ে এ বছর প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেও কিভাবে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রয়েছেন এসব কর্মকর্তা-কর্মচারিরা, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
এদিকে, খাদ্যগুদামে অনিয়ম-দূর্নীতির ঘ্রান পেয়ে  সাংবাদিক পরিচয়ে সাজাদ মনির ও দোয়ারাবাজার এলাকার আবু বক্কর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার কাছে মাসিক ২৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করেছে। গোপন ক্যামেরায় ধারনকৃত খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার বক্তব্যে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ছাতক খাদ্যগুদাম (এলএসডি) কর্মকর্তা সুলতানা পারভীন চাঁদা দাবীর বিষয় প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা ও টন প্রতি ৪হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি সত্য না। তিনি বলেন,  কৃষি অফিস থেকে দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হচ্ছে। তবে কিছু ব্যক্তি দলের পরিচয় দিয়ে ধান ক্রয়ের জন্য তাকে চাপ  দিচ্ছেন। এছাড়া ব্যবসায়ীরা ধান বিক্রির জন্য আসছেন, কিন্তু তাদের ধান ক্রয় করছেন না। কৃষি কার্ড ও এনআইডি দেখে কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে ধান ক্রয় করে তিনি গুদামজাত করছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, খাদ্যগুদামে প্রতি বছর কৃষকদের তালিকা দিলেও তারা পাইকারদের (ব্যবসায়ীর) কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, এখানে তারা কিভাবে ধান সংগ্রহ করছেন তা অবগত করেন নি। খোঁজখবর নিয়ে বিধি মোতাবেক তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই সংবাদটি 256 বার পঠিত হয়েছে