ডেস্ক নিউজ
সুনামগঞ্জের ছাতকে হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে এইচএসসিতে ব্যাপক বিপর্যয়, অংশগ্রহণকারী ৩৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ মাত্র ২ জন। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষক সংকটে, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে না আসা সহ নানা কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে।
তবে শিক্ষার মান সহ নানা অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই, এ দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সচেতন মহল
জানা যায় উপজেলার কালারুকা ইউনিয়নে অবস্থিত হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ১ম বারের মত এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ৩৮ শিক্ষার্থী, এতে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ২জন আর অকৃতকার্য হয়েছেন ৩৬ জন।
এমন ফলাফল হতাশাজনক বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষক সংকট এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার মাত্র ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র পাঁচজনের কিছু বেশি। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ফলাফল নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে পাঠদান কার্যক্রম কতটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়েছে, শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবারই প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় মানবিক বিভাগ চালু রয়েছে। তবে কলেজ শাখার নিজস্ব শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়েই কোনো রকমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকার বিষয়ও উটে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই মুহাম্মদ কামাল বলেন, প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এখানে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের অনেকেই অন্য ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। যাদের পয়েন্ট তুলনামূলকভাবে কম, তারাই মূলত এখানে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসেও অংশগ্রহণ করেনি।
তিনি আরও বলেন, এবারের এইচএসসি ব্যাচ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও আগামী ব্যাচের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী আমাদের কলেজে ভর্তি হয়নি। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমরা ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছি। তবে খারাপ ফলাফলের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, আমাদের কলেজে এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়েই কোনো রকমে ক্লাস পরিচালনা করতে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের বক্তব্যে শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতিকে ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না করেই শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল? শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে তাদের পরীক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কী ধরনের উদ্যোগ ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির এডহক কমিটির সভাপতি মো. গোলাম মাহমুদ আজম ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে অতীতের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বর্তমান পরীক্ষার কঠোরতাকে দায়ী করেছেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন যারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হতো, তাদেরও উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে। এবার বিএনপি সরকার এসে শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্কুল ও কলেজে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এখন আর যে কেউ নকল করতে পারে না। পরীক্ষায় যে প্রশ্ন আসে, যারা তার উত্তর দিতে পারে তারাই উত্তীর্ণ হয়, আর যারা পারে না তারা উত্তীর্ণ হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র কয়েক দিন হয়েছে। বিষয়গুলো সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমাদের হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবো।
তবে সভাপতির এমন বক্তব্যের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব শিক্ষক না থাকা, নিয়মিত পাঠদান না হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ঘাটতির বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, পরীক্ষার হলে নকল প্রতিরোধ কিংবা পরীক্ষার কঠোরতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করাও একটি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। পরে ফলাফল বিপর্যয় এবং কলেজ শাখায় শিক্ষক না থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, নতুন কলেজ হয়েছে, সেখানে শিক্ষক নেই এ বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। আমি একা মানুষ, অনেক দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে হয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যদি আমাকে না জানায়, তাহলে আমি কীভাবে জানব?
তিনি আরও বলেন, এখন বিষয়টি জানতে পেরেছি। কলেজটিতে শিক্ষক নিয়োগসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো গ্রহণের বিষয়ে উদ্যোগ নেব।
সব মিলিয়ে হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের এই ফলাফল বিপর্যয় কেবল পরীক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। কলেজ শাখায় শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া, নিয়মিত পাঠদানের ঘাটতি এবং শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির মতো বিষয়গুলো আগে থেকেই সমাধান করা গেলে ফলাফল এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কলেজ শাখায় প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠদানের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকিও প্রয়োজন।
অন্যথায়, নামের সঙ্গে উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কলেজ যুক্ত থাকলেও বাস্তবে মানসম্মত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এবারের ফলাফল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের জন্যও দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।






