মোঃ খালেদ মিয়া
সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার সড়কের দুই পাশে থাকা প্রায় দুই হাজার গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। বন বিভাগের অনুমোদন ও ইজারার ভিত্তিতে এসব গাছ কর্তন করা হলেও গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া কাগজপত্র অনুযায়ী ইজারা-সীমানার বাইরের গাছ কর্তন ও পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে ২০০২ ও ২০০৩ সালে রোপণ করা রেন্টি, মেহগনি, আকাশমনি, জাম, পিটালী, অর্জুন, ছাতিয়ান, জারুল, গামার, করই, চাম্বল, বাবলা ও কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির শত শত গাছ রয়েছে। প্রায় ২৫ বছর বয়সী এসব গাছের বর্তমান বাজারমূল্য গাছ ব্যবসায়ীদের হিসাবে ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। অথচ ইজারা মূল্য অনুযায়ী ছোটবড় এসব গাছের গড় মূল্য পড়েছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের হাসনাবাদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত একটি লটে কয়েকশ গাছ কর্তনের অনুমতি দেওয়া হয়। সেগুলো কর্তনের পর তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ৪৩৪টি গাছ কর্তনের অনুমতি দেয় সিলেট বনবিভাগ। এছাড়া হাসনাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত আরও একটি লটের ৭০২টি গাছ কর্তন প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ছাতক বনভিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদুস।
২০২৩-২৪ সালে ইজারাকৃত এসব গাছ কর্তনের জন্য সাতটি শর্ত বেঁধে দিয়ে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সিলেট বন বিভাগ সর্বশেষ গত ১০ আগস্ট তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত একটি লটে মোট ৪৩৪টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কর্তনের অনুমতি দেয়। এর ইজারা মূল্য ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
তবে কাগজে-কলমে নির্ধারিত সীমানা ও শর্ত ভঙ্গ করে গাছ কর্তন ও পরিবহনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের অনুমতিপত্রে তকিপুর মসজিদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ৪৩৪টি গাছ কর্তনের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে তাজপুর থেকে গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত গাছ কর্তন করা হয়েছে বলে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বেশিরভাগ গাছের বাজারমূল্য ১০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এর আগেও একই পদ্ধতিতে হাসনাবাদ থেকে তাজপুর পর্যন্ত একটি লটের কয়েকশ গাছ কর্তন করা হয়েছে। এছাড়া ছাতক-দোয়ারাবাজার সড়কে আরও দুটি লটে ৯২টি গাছ কর্তন করা হয়েছে। এই চার লটের ইজারা পেয়েছেন সুনামগঞ্জের সুমন। চার লটের ইজারা এক হাতে থাকায় ইজারা প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। পরবর্তী ইজারাও সিন্ডিকেটের সদস্যদের হাতে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা মূল্যের গাছ নামমাত্র মূল্যে নিলাম করা হয়েছে। এসব গাছের মোট পাঁচটি লটের মধ্যে চারটিরই সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয়েছেন সুনামগঞ্জের সুমন আহমদ। তিনি দ্রুত সময়ে ওই চার লটের গাছ কর্তন করেছেন। অন্যদিকে হাসনাবাদ থেকে ছাতক পর্যন্ত ৭০২টি গাছের লটের সর্বোচ্চ দরদাতা কে, সে তথ্য স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তার কাছে এখনো আসেনি বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাছ নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ তকিপুর থেকে তাজপুর পর্যন্ত ৪৩৪টি গাছের লটের ইজারা ও মূল্য নিয়ে গত ২৭ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েছে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি নামে একটি সামাজিক সংগঠন। অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, সিলেটের বন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দপ্তরে। এতে গাছের মূল্য, নিলাম প্রক্রিয়া ও কাঠের পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া বন বিভাগের দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করে রাতে গাছ কর্তন ও পরিবহনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরুতে গভীর রাত পর্যন্ত গাছ কাটা ও পরিবহন করা হয়েছে। এমনকি কাগজে-কলমে উল্লেখিত ইজারা-সীমানার বাইরের গাছ কর্তনের অভিযোগও রয়েছে।
একই চিত্র দোয়ারাবাজারের কারুলগাঁও থেকে বেতুরা সড়কেও। সেখানে দুটি লটে মোট ৯২টি গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সড়ক প্রশস্ত করার কাজের জন্য গাছগুলো কাটার প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার অনেক আগেই ওই সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে-যে সড়ক প্রশস্ত করার কাজের জন্য গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেই সড়কের কাজ গাছ কাটার আগেই কীভাবে শেষ হলো? বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দেরি হওয়ায় রাস্তার কাজ আগে সম্পন্ন হয়েছে এবং ইজারাদার নিয়ম অনুযায়ী গাছ কর্তন করছেন।
ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে গিয়ে কর্তন করা গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য গাছ গুনে প্রকৃতপক্ষে কতটি গাছ কাটা হয়েছে, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান গাছের সংখ্যা এবং কাগজপত্রে উল্লেখিত সংখ্যার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
স্থানীয়দের দাবি, কর্তনকৃত গাছের প্রকৃত সংখ্যা, প্রজাতি, বয়স ও বাজারমূল্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সরকারি রাজস্বের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ইজারাদার সুমন আহমদ চার লটের ইজারা তিনি পেয়েছেন জানিয়ে রাতে গাছ কর্তন ও পরিবহনসহ ইজারা-সীমানার বাইরে গাছ কর্তনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শেষ করতে একটু দেরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন। তার কাছে ইজারা সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র চাইলে তিনি দিবেন বলে এখনো দিয়ে সহযোগিতা করেন নি।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের অফিসিয়াল টিএনটি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ছাতক বনবিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদৌস বলেন, ‘‘কাগজে ভুল লেখা হয়েছে। মার্কিং মূলত গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট পর্যন্তই। ইজারার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ করেছে। কর্তনের শর্ত ভঙ্গ করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দোয়ারাবাজার অংশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওয়ার্ক অর্ডার পেতে দেরি হওয়ায় রাস্তার কাজ আগে সম্পন্ন হয়ে গেছে।’’
প্রায় ২৫ বছর বয়সী মূল্যবান গাছ নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে কি না, ইজারা-সীমানার বাইরে কোনো গাছ কাটা হয়েছে কি না, কাগজপত্রে উল্লেখিত গাছের সংখ্যার সঙ্গে বাস্তবে কাটা গাছের সংখ্যা মিলছে কি না এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না-এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন, সড়ক প্রশস্ত হবে, উন্নয়ন হবে-এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু উন্নয়নের আড়ালে সরকারি সম্পদের মূল্যবান গাছ যদি কম দামে বিক্রি হয় কিংবা অনুমোদনের বাইরে গাছ কাটা হয়, তাহলে সেই ক্ষতির দায় নেবে কে? সংশ্লিষ্টদের মতে, গাছগুলোর সরকারি নির্ধারিত মূল্য, ইজারা মূল্য, প্রকৃত সংখ্যা ও কর্তনের সীমানা পুনরায় যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।






