মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—বাঁশতলা-হকনগরে উন্নয়নের জোর দাবি

ইয়াছিন আলী খান, দোয়ারাবাজার::
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বাঁশতলা-হকনগর অঞ্চল আজ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটন সম্ভাবনা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের কারণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সম্ভাবনার এই জনপদ এখনও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ডাবল লেন সড়ক নির্মাণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা এ অঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেলা বাজার সংলগ্ন বাঁশতলা-হকনগর এলাকা মহান মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবময় অধ্যায়ের সাক্ষী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান এবং তাঁদের স্মরণে নির্মিত বাঁশতলা-হকনগর স্মৃতিসৌধ আজও স্বাধীনতার ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী মানুষ ও পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন। ইতিহাসের স্পর্শ এবং সীমান্তঘেঁষা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের মুগ্ধ করে।
বাঁশতলা-হকনগর এলাকা থেকে চোখে পড়ে ভারতের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্য। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কিন্তু পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো উন্নত হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাঁশতলা-হকনগর স্মৃতিসৌধ থেকে ছাতক সুরমা সেতু পর্যন্ত সড়কটি সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় যান চলাচলে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।
তাদের দাবি, দ্রুত এ সড়ককে ডাবল লেনে উন্নীত করা হলে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
এ অঞ্চলের আরেকটি বড় সম্ভাবনা সীমান্ত বাণিজ্য। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অতীতে এ সীমান্তে কাস্টমস কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমানে ভারতের চেলা বাজার এবং বাংলাদেশের ফোরকান-বাঁশতলা সীমান্ত দিয়ে বৈধ আমদানি-রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতি ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন বা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, সৃষ্টি হবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং সীমান্ত অঞ্চলটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, পর্যটনের টেকসই বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণের স্বার্থে বাঁশতলা-হকনগর স্মৃতিসৌধ থেকে ছাতক সুরমা সেতু পর্যন্ত সড়ককে দ্রুত ডাবল লেনে উন্নীত করা এবং চেলা-ফোরকান সীমান্তে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
তাদের প্রত্যাশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে। কারণ, বাঁশতলা-হকনগরের উন্নয়ন শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে বাঁশতলা-হকনগর আজ উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এখন প্রয়োজন শুধু সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ, যাতে এই সম্ভাবনাময় অঞ্চল দেশের অর্থনৈতিক ও পর্যটন মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল স্থান করে নিতে পারে।

এই সংবাদটি 30 বার পঠিত হয়েছে